বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি

মজুদ সংকটে তেলভিত্তিক কেন্দ্র বাড়তে পারে লোডশেডিং

গ্রীষ্মের দাবদাহ বাড়ার সঙ্গে দেশে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। বর্তমানে বিদ্যুতের উৎপাদন রাতের বেলায় ১৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছেছে।

গতকাল সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদার প্রাক্কলনে তা ১৫ হাজার ৯০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এরই মধ্যে বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনে ঘাটতি থাকায় এক হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হচ্ছে। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বর্তমানে জ্বালানি তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। তবে সামনে দাবদাহ বাড়লে পিক ডিমান্ড মেটাতে তেলভিত্তিক কেন্দ্র সচল রাখতে জ্বালানি মজুদ বাড়ানোর প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন বেসরকারি উদ্যোক্তারা। বর্তমানে যে হারে জ্বালানি তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ নেয়া হচ্ছে, তাতে চলতি মাসের ১৫-২০ তারিখের মধ্যে মজুদ সংকটে পড়তে পারে বেশির ভাগ কেন্দ্র। যদিও বেসরকারি উদ্যোক্তারা বলছেন, মে পর্যন্ত ফার্নেস অয়েল কেন্দ্রগুলো চালিয়ে নেয়ার জন্য তারা রেশনিংয়ের পরিকল্পনা করছেন।

বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়া ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ বকেয়া পেতে তারা বিগত সরকারের সময় থেকে চাহিদা অনুযায়ী অর্থ পাননি। বেসরকারি মালিকেরা নিজ উদ্যোগে জ্বালানি তেল আমদানি করে কেন্দ্র চালিয়েছেন। তবে সেই পরিস্থিতিও এখন আর নেই বলে জানান তারা। পাইপলাইনে কোনো ফার্নেস অয়েল আমদানির এলসিও নেই বলে জানা গেছে। এ পরিস্থিতির মধ্যে সরকার দ্রুত অর্থ ছাড়লেও দেশে ফার্নেস অয়েল আসতে মে মাসের মাঝামাঝি সময় ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ওপর ফার্নেস অয়েলের দাম বিশ্ববাজারে ৭০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো প্রকট হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিপিডিবির চাহিদা অনুযায়ী এখনো বিদ্যুৎ সরবরাহ দিয়ে যাচ্ছি। তবে যে হারে উৎপাদন হচ্ছে, তাতে এ পরিস্থিতি সামনে হয়তো আর থাকবে না। যে পরিমাণ ফার্নেস অয়েল মজুদ রয়েছে, তা এ ১৫-২০ এপ্রিলের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। ফলে তেলভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন রেশনিং করে আগামী মে পর্যন্ত চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি। সেক্ষেত্রে হয়তো ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কমাতে হবে। আমরা চেষ্টা করব পরিস্থিতি সামাল দিতে বিপিডিবিকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেয়ার।’

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে আরেকজন আইপিপি উদ্যোক্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে আমরা বিপিডিবিকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছি। তবে কয়েক মাস ফার্নেস অয়েল আমদানি করতে না পারায় অনেক কেন্দ্র মজুদ সংকটে পড়েছে। বর্তমান ফার্নেস অয়েলের দাম চিন্তা করলে আমদানি করতে হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন। এর বাইরে এলসি সেটলমেন্ট জটিলতা রয়েছেই। এ পরিস্থিতির মধ্যে আমরা সরকারের বিদ্যুৎ চাহিদায় উৎপাদন করে যাচ্ছি।’

বিপিডিবির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদার প্রাক্কলন ছিল ১৫ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট, আর দিনের বেলায় তা ছিল ১০ হাজার ৪৬০ মেগাওয়াট। তবে ঘণ্টাভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, দিবাগত রাত ১টায় সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট, বিপরীতে উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ৬৭৪ মেগাওয়াট। এতে অন্তত ১ হাজার ৭৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়। গতকাল বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ চাহিদা ও উৎপাদনে অন্তত ৬৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং ছিল।

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ এপ্রিল বিদ্যুতের মেক্সিমাম জেনারেশন ছিল ১৪ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট। ওই দিন জ্বালানি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সর্বোচ্চ উৎপাদন ছিল ২ হাজার ৯৬৯ মেগাওয়াট। বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন নিয়েও ওইদিন সর্বোচ্চ ১ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয়েছে।

দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ও উৎপাদনে ঘাটতি হওয়ায় লোডশেডিং করে সামাল দিতে হচ্ছে বিতরণ কোম্পানিগুলোকে। তবে শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও গ্রামে ব্যাপক হারে লোডশেডিং হচ্ছে। দিনের বেশির ভাগ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। প্রতি ঘণ্টায় কয়েকবার করে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কথা জানান বেশ কয়েকটি জেলার বিদ্যুতের গ্রাহকেরা।

দেশে গ্যাস, কয়লা, জ্বালানি তেল, আমদানি ও নবায়নযোগ্য উৎস মিলিয়ে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। চলতি বছরে সর্বোচ্চ চাহিদার প্রাক্কলন ১৮ হাজার মেগাওয়াট হলেও জ্বালানির সংস্থান না থাকায় কয়লা, গ্যাস ও তেলভিত্তিক কেন্দ্রের সক্ষমতার বড় অংশই বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। তবে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে বড় সংকট তৈরি হয়েছে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ঘাটতিতে। বিদ্যমান সক্ষমতার মধ্যে অর্ধেকের কিছু বেশি চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে, বাকি অংশ কয়লার অভাব ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বন্ধ রয়েছে।

ভারতের ঝাড়খন্ডের গড্ডায় নির্মিত আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা এখন সাড়ে ৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এর মধ্যে এপ্রিলে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ৭ হাজার ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করতে চায় পিডিবি। তবে কয়লার সরবরাহ নিয়েও অনিশ্চয়তা আছে। এর মধ্যে আদানির বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার মধ্যে একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কেন্দ্রটি থেকে প্রায় ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিপিডিবির শীর্ষ এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়তে শুরু করেছে। সব ধরনের কেন্দ্র ব্যবহার করে চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা চলছে। তবু কিছুটা লোডশেডিং হচ্ছে। এটার প্রধান কারণ মূলত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন কম হওয়া।’

আরও